statcounter

Sunday, May 29, 2016

নরওয়ের জঙ্গলে

হেঁটে যাচ্ছিল মিমসা। পিঠে রাকস্যাক, পায়ে স্নিকার। জীন্স টা গোড়ালির কাছে ছিঁড়ে গেছে , টী শার্টে খাবারের দাগ। ছোট ছোট চুল, অবিন্যস্ত,  যাতে চোখের উপর এসে না পরে তার জন্য বান্ডানা বাঁধা। বড্ড রোদ, তাই চোখে সানগ্লাস। হাতে ঘড়ি। হেঁটে যাচ্ছিল মিমসা, পেছন দিকে না তাকিয়ে। ট্রেন লাইনের পাশ দিয়ে, পাথরের উপর দিয়ে, মাঝে মাঝে হয়ে আছে ঘাস, সেগুলো কে মাড়িয়ে। অন্যমনস্ক, কিন্ত ু স্থির লক্ষ্যে।

তরু দেখছিল।  তরুর হাতে ধরা  " অন্ধ উইলোর নীচে ঘুমন্ত রাজকন্যে"। মিমসার দেওয়া জন্মদিনের উপহার নং ১ আর দ্বিতীয় উপহার এই চলে যাওয়াটা- ভাবছিল তরু। চলে যাওয়াটার মধ্যে একটা সংকল্প ছিল, আর না ফেরার, দৃঢ সংকল্প -- মিমসার প্রত্যেকবার চলে যাবার মধ্যে যেটা থাকে। তবু আজকের যাওয়া কেমন অন্যরকম---প্রতিবারের মতই ভাবলো তরু।

বিকেলে অটোয় বাড়ি ফিরতে ফিরতে বৃষ্টি চলে এল। ছাতা নেই কারোর কাছেই---মিমসা বৃষ্টি ভালবাসে। ঝম ঝম শব্দ, ঠান্ডা হাওয়া, ভেজা রাস্তা ঘাট, জমা জল, উলটে পড়ে থাকা টব এর মধ্যে বেঁকে যাওয়া ছোট ফুলগাছ, সোঁদা হাওয়া উড়তে থাকা তুলতে ভুলে যাওয়া ভেজা শাড়ি, ফুটপাথের দোকানের জল জমা প্ল্যাস্টিকের ছাদ; যেটা থেকে বৃষ্টি থেমে  যাবার পরও বৃষ্টি পড়ে--- মিমসা এই সবকিছু ভালবাসে।

নিশ্চয় খুব দূরে যায়নি----বৃষ্টিতে একলা ভিজতে ভিজতে ভাবল তরু।

মোজা দুটো ফেলে গেছে, দু রঙের মোজা। বড্ড তাড়ায় ছিল। স্টেশন পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেল, হাতে বইটা দিয়ে হেঁটে চলে গেল-- ট্রেনে ওঠার কথা মনে হয় মনে পড়েনি।
ডিনার খেতে খেতে ভাবছিল তরু। সামনে খাতার স্তূপ, জমা দিতে হবে দেখে।

"প্রথম সভ্যতা কোথায় গড়ে উঠেছিল?"
"নদী তীরে।"

নাম না জানা এক নদীর পাড়ে বসে ছিল দুজনে। ছোট নদী, দূরে কোথাও বড় নদীতে মিশেছে। মাছ -টাছ নেই, হালকা ঘোলা মতন জল, গাছের ছায়া পড়ে সবজেটে। নদীর ওপারে ধানের জমি, চাষ হচ্ছে। সাইকেল করে মেয়েরা স্কুল যাচ্ছে। পাখি ডাকছে - টি টি করে। ফেরীওলা চলে গেল। মিমসার তেষ্টা পেতে লাগল। জল খুঁজতে বাস গুমটি। নদীটা হারিয়ে গেল।

নদী হারায় নাকি!!! কত দিন ধরে এক রাস্তায় চলছে---রাস্তা পালটে নিচ্ছে ইচ্ছে মত।
মানুষ ই হারায়---নদীকে, মাঝে মাঝে নিজেকে।
মিমসা তাই ভাবে। অন্তত তরুর তাই মনে হয়।

ছাতিমের গন্ধ আসছে। এই ভরা বৃষ্টিতে ছাতিমের গন্ধ !!! তরুর মাথার মধ্যে মিমসা। হাঁটছে---মাথা দুলিয়ে হাসছে--- জানলার উপরে বসে আছে---- হাতে পেনসিল, মগ্ন হয়ে দেখছে ফাঁকা ক্যানভাসের দিকে।

তরুর ছবি আঁকছিল একটা-- পোর্ট্রেট, পেনসিল স্কেচ। অসমাপ্ত পড়ে আছে সেটা।
হাসপাতালে লম্বা ওয়েটিং গুলোতে ছবি আঁকতো বসে। পেনসিলে। বাড়িতে রঙিন--- উজ্বল লাল, সবুজ, হলুদ।

উফফ। এসব  ভাবছি কেন? নিজেকে বকে দিল তরু। জন্মদিনের রাত।

বাড়ির পাশে একটা সিনেমা হল-----চিত্রা। তাতে যত রাজ্যের বাজে সিনেমা চলে। মিমসা সবকটা দেখতে যেত। সিনেমা দেখতে নয়, যারা গেছে তাদের দেখতে। তরু গেল আজকে। 

দাদা দুটো টিকিট দিন।

সিনেমা শুরু হল। রাতের সিনেমা, ভীড় ভালই, অনেকেই ঘুমুতে আসে এই হলে--- যাদের কোথাও থাকার জায়গা নেই---বৃষ্টি হলে ভীড় আরো বাড়ে।

তরু চারদিক দেখছিল।

মিমসা এল। পাশে বসল। সিনেমার মাঝখানে উঠে গেল। পর্দায় তখন খুব জোরে বৃষ্টি নেমেছে , নায়ক নায়িকা দৌড়াচ্ছে।

হল থেকে বেড়িয়ে মিমসা হেঁটে যাচ্ছিল। ১২ টা বেজে গেছে, তরুর জন্মদিন এই বছরের মতন শেষ। হেঁটে যাচ্ছিল মিমসা, পেছন দিকে না তাকিয়ে, অন্যমনস্ক ভাবে, কিন্ত ু স্থির লক্ষ্যে।








2 comments: