হারানো টুপি
দশটার ট্রেন ধরেছিল বিতান। ভাবেনি বসার সিট পাবে। যা দিনটা গেল আজকে।চাকরিটা আর থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। সেলসের টার্গেট হিট করতে পারেনি লাস্ট ৩ মাস হলো। সেই নিয়ে আজকে অফিসে মিটিং ছিল। ১ মাসের টার্গেট দিয়েছে, সেটা পূরণ না করতে পারলে অন্য চাকরি খুঁজতে হবে। এইসব ভাবতে ভাবতে চোখ জুড়ে ঘুম এসেছিল বিতানের। হঠাৎ গায়ের কাছে কী একটা নড়ে উঠতে ঘুমটা ভেঙে গেল। ইস্, আর একটু হলেই কোন্নগর স্টেশন পেরিয়ে গেছিল। এক লাফে উঠে পাশ থেকে ব্যাগটা নিয়ে বিতান প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়লো। আজকে হেঁটেই বাড়ি যাবে। মিনা দিদি আজকে আসেনি, তাই স্টেশন থেকে রাতের খাবার কিনে বাড়ির রাস্তা ধরল বিতান।
বিতানের কথা:
"উফ্ চাকরি নাকি চাকরি! ভালো লাগে না আর। চাকরি গেলে যাক... যা জমিয়েছি তাতে মাস ছয়েক চলে যাবে। তারপর দেখা যাবে। হাতের ব্যাগটা একটু ভারী ভারী লাগছে... কি জানি। আজকে আসলে খুব টায়ার্ড লাগছে। শর্বরীকে ফোন করতে হবে... কিন্তু বড্ড টায়ার্ড আজকে।"
বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিতান ব্যাগটা খোলে।
"এবাবা! এটা আবার কী ব্যাগের মধ্যে? এই লম্বা টুপিটা কোত্থেকে এলো! কী অদ্ভুত দেখতে রে, কিন্তু বেশ চক্ চক্ করছে।" মাথায় টুপিটা দিয়ে দেখে বিতান।
"আরি বাস, লাগছে খাসা!"
মাথাটা ঝিমঝিম করছে, কেমন কানের পাশে কে যেন গুনগুন করছে... না,না সেলসের চাকরি আর ভালো লাগে না। কতদিন এক লাইনও লেখালিখি করিনি... ভুলেই গেছি সব। মাথাটা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে আসছে যেন। ঠিক যেন মুক্তেশ্বরের নীল আকাশ, ভীষণ বৃষ্টির পরে মেঘ কেটে আলো ফুটেছে, এখনও বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ... শিরশিরে হাওয়া দিয়েছে... কানের কাছে গুনগুন করে কে যেন বলছে... কিছুটা কবিতা কিছুটা গদ্য, কিছু পাহাড় আর মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন... "তুমি তো লেখক বাপু... বেচুবাবু হতে গেলে কেন!"ঘুম পাচ্ছে বিতানের খুব। চোখ জুড়ে ঘুম..
পরদিন সকালে টুপিটা দেখে বিতান ভীষণ অবাক। " কী অদ্ভুত রে বাবা! কালকে টেবিলে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম... কখন বিছানায় গিয়ে শুয়েছি মনে নেই। টুপিটা টেবিলের পাশে ছিল, শোকেসে কে ঢোকাল?" এইসব ভাবনার মধ্যে মীনাদিদি এসে ঢুকল ঘরে। আর ঢুকেই তার চোখ গেল টুপির দিকে। "এটা কী গো বিতান দাদা... কীরকম অদ্ভুত দেখতে টুপি, মনে হচ্ছে চোখ-মুখ আছে।" বলতে বলতে হাতে তুলে মাথায় পরে ফেলে টুপিটা।
মীনার কথা:
একই রে বাবা! কানের কাছে গান গাইছে কে! আবার প্রেসার লো হচ্ছে নাকি? ভাবতে ভাবতে মীনা বসে পড়ে মাটিতে। "হুমম... হুমম... রান্না ভালো লাগে কিন্তু সব চেয়ে ভালো লাগে সাজতে আর সাজাতে। আঁকার হাত আছে... আলপনা দিতে পটু। রান্না না করে ছবি আঁকলে ভালো করতিস রে মেয়ে"——এইসব কে বলছে কানের পাশে? ওরে বাবা মাথা ঘুরছে... "ও বিতান দাদা আমার মাথা ঘুরছে গো!" মীনা শুয়ে পড়ে। বিতান আস্তে আস্তে টুপিটা খুলে নেয়। জল এনে দেয় মীনাদিকে।
শর্বরীর কথা:
নাহ্ আর চলছে না। আজকে একটা এসপার নয়তো ওসপার করতে হবে। বিতান থাকুক নিজের মতন, আমি বাড়ির দেখা ছেলেকে বিয়ে করে নেব। ওই আসছেন তিনি। হাতে আবার কিসের প্যাকেট! বিতান এসে প্যাকেটটা খুলে টুপিটা দেখায় শর্বরীকে। "পরবি?" "ইস্ এটা কী অদ্ভুত দেখতে! ওসব আমি পরি না..." বলার আগেই টুপিটা মাথায় পরিয়ে দেয় বিতান।
"কিরে মেয়ে... ভালোবাসা নাকি সুখ? সুখের দিকেই তো পাল্লা ভারী। এই বেলা মানে মানে মনের কথাটা বলে ফেল... নইলে সারাজীবন পস্তাবি।" এক টানে টুপিটা খুলে ফেলে শর্বরী। "একটা কাজ আছে." বলে উঠে চলে যায়। বিতান তাকিয়ে থাকে জানালা দিয়ে। শর্বরীর চলে যাওয়াটা কেমন পালিয়ে যাওয়ার মতন লাগছে না? রাস্তার শেষে গিয়ে শর্বরী ফিরে তাকায়... ওর চোখে কি জল নাকি বিতানের চোখে জল? ঝাপসা কাঁচের মধ্যে দিয়ে ঠিক বোঝা যায় না।
এখন বেশ রাত। বিতান আজকে আর অফিস যায়নি। শর্বরীর সাথে দেখা করার পরে ওকে একটা মেসেজ করেছিল তারপর ফোনটা বন্ধ করে রেখেছে। গঙ্গার ধারে আজকে খুব হাওয়া, চাঁদের আলো যেন অতি তীব্র... আকাশে মেঘেরা আসছে আবার সরে সরে যাচ্ছে, গঙ্গার ওপারে আলো জ্বলছে নিভছে... অনেক দূরে কোথাও ঢাক বাজছে... উলুধ্বনি শুরু হলো তার সাথে. বিতানের পাশে একটা ফুচকাওয়ালা দোকান গোটাচ্ছে.... দু-তিন জন লোক হেঁটে চলছে বাড়ির দিকে। বিতান বসে আছে। মাথায় টুপি। কানের কাছে মশা গুনগুন করছে, ফুচকাওয়ালা তেঁতুল জলটা ঢেলে দিল ঘাটের উপরে... টক গন্ধে ভরে গেল চারপাশ। কে যেন ধূপ জ্বালিয়ে গেল... কানের পাশে কে যেন সেতার বাজাচ্ছে, আশাবরীর করুণ সুর... ভীষণ ঘুম পাচ্ছে বিতানের।
মাথায় টুপি পরা একটা লোক আস্তে আস্তে আকাশে উঠে গেল... ফুচকাওয়ালা সব কাজ শেষ করে বিড়ি টানছিল... সারাদিন কাজের পরে এইসব কী দেখছে... চোখের ভুল নিশ্চয়ই। আসতে আসতে বাড়ির পথ ধরে সে।
বিতান এখন শুয়ে আছে মুক্তেশ্বরের পাহাড়ের ধারে। মাথার উপরে নীল আকাশ... একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে... মেঘ কেটে আলো ফুটেছে... বাতাসে এখনো বৃষ্টির গন্ধ... দূরে একটা পাখি ডাকছে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। আজকে মনে হয় আবার বৃষ্টি হবে। একটু আগে শর্বরীর বিয়ের কার্ড এসেছে ইমেলে। আর একটা পাবলিশারের চিঠি... তারা বিতানের কবিতা নিয়ে কথা বলতে চায়। বিতানের পাশে টুপিটা ঘুমোচ্ছে। অনেকটা সময় আর অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে সে। টুপির বয়স হয়েছে... সে-ও বিশ্রাম চায়। চায়ের কাপে চা জুড়িয়ে জল, একটা কুকুর এসে পাশে বসল। বিতান তার গায়ে হাত বোলাতে লাগল।
Comments
Post a Comment